দীর্ঘ চার দশক পর চুরি হওয়া একটি বুদ্ধমূর্তি ফিরে পেয়ে উৎসব মেতে উঠেছে হিমালয়ের দেশ নেপাল। ১৩শ’ শতকের ঐতিহাসিক মূর্তিটি রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি প্রাচীন মন্দিরে পুনঃস্থাপন করা হয়েছে।
শুক্রবার ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের তালে তালে পালকিতে করে মূর্তিটি মন্দিরে নেওয়া হয়। এ সময় বিপুল ভক্তের উপস্থিতিতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
৬৭ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা সুনকেসারি শাক্য বলেন, “আমি ভীষণ খুশি। আমাদের দেবতা আবার ফিরে এসেছে।”
এ সময় তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৮০-এর দশকে যখন মূর্তিটি চুরি হয়, তখন পুরো এলাকায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসা
মূর্তিটি ২০২২ সালে নিউইয়র্ক থেকে নেপালে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি তার মূল পাথরের বেদিতে স্থাপন করা হয়। বুদ্ধ জয়ন্তী উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জন্মবার্ষিকী হিসেবে উদযাপিত হয়।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোর উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, “অতীতে ভুলভাবে হাতবদল হওয়া এসব অমূল্য নিদর্শন ফেরত আনার চেষ্টা করছি আমরা।”
এর মধ্য দিয়ে “আমরা অতীতের একটি ভুল শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করছি,” বলেন গোর।
যেভাবে চুরি হয়
নেপালের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্যানুযায়ী, মূর্তিটি ১৯৮০-এর দশকে মন্দির থেকে চুরি হয়। পরে এটি নিউইয়র্কের তিব্বত হাউস ইউএস-এ পাওয়া যায়, যেখানে এক অজ্ঞাত সন্ন্যাসী এটি উপহার দিয়েছিলেন।
প্রতিলিপি সরিয়ে আসল মূর্তি স্থাপন
মূর্তিটি অনুপস্থিত থাকায় স্থানীয়রা এতদিন একটি প্রতিলিপিতে পূজা করতেন। এখন আসল মূর্তিটি পুনঃস্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিলিপিটি মন্দিরের অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চুরি হওয়া ঐতিহ্য ফেরানোর উদ্যোগ
প্রায় তিন কোটি সংখ্যার দেশ নেপালে ধর্মীয় স্থাপনা ও ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে দেশটি বাইরের বিশ্বের পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর বহু মূল্যবান প্রত্নসম্পদ চুরি হয়ে যায়।
এইসব নিদর্শনের অনেকগুলো যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের শিল্পবাজারে পৌঁছে যায়- যদিও এগুলো রফতানি আইনত নিষিদ্ধ ছিল।
এখন পর্যন্ত কত নিদর্শন ফিরেছে?
নেপালের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জানায়, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০টি প্রত্নবস্তু দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- কাঠ ও পাথরের খোদাই, চিত্রকর্ম, ধর্মীয় পাণ্ডুলিপি, দেবদেবীর মূর্তি ইত্যাদি। এর মধ্যে অন্তত ৪১টি নিদর্শন তাদের মূল স্থানে পুনঃস্থাপন করা হয়েছে।
সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র পুরী বলেন, “এসব মূর্তি শুধু শিল্পকর্ম নয়, এগুলো আমাদের জীবন্ত ঐতিহ্যের অংশ।”
সরকারি হিসেবে ৪০০-এর বেশি নিদর্শন এখনও নিখোঁজ রয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা প্রকৃত সংখ্যা হাজারের বেশি হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য থেকে আরও নিদর্শন ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুরি হওয়া প্রত্নসম্পদ ফেরত আনার এই ধারাবাহিক উদ্যোগ শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নৈতিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। সূত্র: আল-জাজিরা
Email:-todaysomoysangbad@gmail.com
Copyright © 2026 টুডে সময় সংবাদ. All rights reserved.