ঢাকার সাভারে পূর্ববিরোধের জেরে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্জন স্থানে নিয়ে নির্মম নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায়, প্রাণনাশের হুমকি এবং কয়েক মাস পর আবারও তুলে নিয়ে মারধর ও টাকা-মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার একটি নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ২৭ দিন প্রাণভয়ে আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে রোববার (৫ জুলাই) রাতে ভুক্তভোগী সাভার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
থানায় দায়ের করা অভিযোগে ব্যবসায়ী মো. সুমন শেখ জানান, তার চাচা মোরশেদ আলম ২০১৯ সালে রাজাশন পালোয়ানপাড়া এলাকায় অবস্থিত নিজ মালিকানাধীন 'রাজধানী বেকারি'র স্থাপনা ২৭ লাখ টাকায় সিরাজুল ইসলামের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু পুরো অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই বিরোধে বকেয়া ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায়ের বিষয়ে আইনি পরামর্শ দেওয়ায় অভিযুক্তরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর বিকেলে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থানকালে দেশীয় অস্ত্রধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক একটি মাইক্রোবাসে তুলে অপহরণ করে। পরে ভাকুর্তা ইউনিয়নের শ্যামলাসী এলাকার একটি নির্জন ঘরে নিয়ে চোখ বেঁধে লোহার রড ও পাইপ দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এতে তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং ডান হাত মারাত্মকভাবে জখম হয়।
ভুক্তভোগীর দাবি, নির্যাতনের একপর্যায়ে তার হাত-পা বেঁধে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ানো হয় এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয়। একপর্যায়ে তার স্ত্রী ধারদেনা করে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে অভিযুক্তদের হাতে তুলে দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে বাকি টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে তাকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও অভিযুক্তরা বারবার তার বাড়িতে গিয়ে অবশিষ্ট টাকা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে। অভিযুক্তদের ভয়ে তিনি দীর্ঘদিন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চলতি বছরের ৯ জুন রাতে রাজাশন এলাকায় অটোরিকশায় বাড়ি ফেরার পথে অভিযুক্তরা আবারও তার গতিরোধ করে জোরপূর্বক একটি বেকারির ভেতরে নিয়ে যায়। সেখানে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে রেখে হাত-পা বেঁধে মারধর ও নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় তার কাছ থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং একটি অপ্পো মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা পুনরায় টাকা পরিশোধের আলটিমেটাম দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগে বলা হয়।
এদিকে, ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে একজন ব্যক্তিকে নির্মমভাবে মারধর ও নির্যাতনের দৃশ্য দেখা যায়, যা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা ও ঘটনার সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ভুক্তভোগী অভিযোগে অপহরণ, অবৈধভাবে আটকে রেখে নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায়, ছিনতাই, হত্যাচেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ও চলতি দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর মোহাম্মদ বলেন, ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা জানান, ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে এলাকাজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
Email:-todaysomoysangbad@gmail.com
Copyright © 2026 টুডে সময় সংবাদ. All rights reserved.