
সংগৃহীত ছবি
পিতার অকাল প্রয়াণে ১৪ বছরের এক অবুঝ কিশোর মিশকাতের কাঁধে চেপে বসেছিল পুরো সংসারের গুরুভার। উপার্জনের একমাত্র সম্বল—একটি ইজিবাইক। তবে সেই সম্বলটুকুও কেড়ে নিতে দ্বিধা করেনি এক নির্মম দস্যু চক্র। যাত্রীর বেশে উঠে নির্জন বাগানে হাত-পা বেঁধে ইজিবাইক ও ফোন লুটে নিয়ে চম্পট দেয় তারা। কিন্তু অপরাধীদের শেষ রক্ষা হয়নি। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ ও সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেলের চৌকস অভিযানে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহের বিভিন্ন স্থান থেকে ওই দস্যু চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সাথে উদ্ধার করা হয়েছে লুন্ঠিত ইজিবাইক, মোবাইল ফোন ও বিক্রয়লব্ধ অর্থ।
কোটচাঁদপুর উপজেলার তালসার গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে মিশকাত। পরিবারের একমাত্র ভরসা হিসেবে প্রতিদিনের মতো গত ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৫:০০ ঘটিকায় কোটচাঁদপুর রেলগেট থেকে চারজন যাত্রীকে নিয়ে রওয়ানা হয় সে। ছদ্মবেশী ওই চার দস্যু মিশকাতকে ঝিনাইদহ সদর থানাধীন সুতরের খাল বংকিরা মাঠ এলাকার একটি নির্জন মেহগনি বাগানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জোরপূর্বক মুখ ও হাত-পা বেঁধে রেখে ইজিবাইক এবং ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় ভিকটিমের চাচা বাদী হয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় অজ্ঞাতনামা চার আসামির বিরুদ্ধে একটি এজাহার দায়ের করেন (মামলা নং-৩৭, তারিখ: ২১ জুলাই, ২০২৬; ধারা- ৩৯৪, দ্য পিনাল কোড, ১৮৬০)।
একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম হারিয়ে নিঃস্ব কিশোরের খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নজরে আসা মাত্রই ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ সুপার জনাব মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন্ হাছান, পিপিএম দ্রুততম সময়ে ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ নির্দেশনা দেন।
তাঁর প্রত্যক্ষ মনিটরিংয়ে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল ও ঝিনাইদহ সদর থানা পুলিশের একটি চৌকস তদন্ত দল মাঠে নামে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শুরু হয় তিন জেলায় সাঁড়াশি অভিযান।
তদন্তকারী দল ধারাবাহিক অভিযানে চালিয়ে একের পর এক চক্রের সদস্যদের জাল বন্দি করে:
চুয়াডাঙ্গা সদর: ইজিবাইক লুন্ঠনে সরাসরি সম্পৃক্ত মূল অভিযুক্ত মোঃ আকাশ সর্দার ওরফে ডাকাত আকাশ-কে গ্রেফতার করা হয়।
কুষ্টিয়া সদর: সরাসরি জড়িত আরও তিন দস্যু—মোঃ জিয়ারুল ওরফে জিয়া (৪৪), মোঃ সিরাজুল ইসলাম (৪০) এবং মোঃ আখতার মোল্লা (৪০)-কে গ্রেফতার করা হয়।
চোরাই মালামাল কেনাবেচায় জড়িতদের গ্রেফতার: ধৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুষ্টিয়া সদর থেকে মালামাল কেনাবেচায় জড়িত রাশিদুল ইসলাম ওরফে বল্টু (৫০), মোঃ লিটন আলী (৫০), মোঃ সজীব শেখ (২৪), মোঃ মাসুদ রানা (৩২); কুমারখালী এলাকা থেকে মোঃ ইসলাম খান ওরফে তাহের (৬৫) এবং মিরপুর থানা এলাকা থেকে মোঃ আশরাফুল ইসলাম (৪২)-কে গ্রেফতার করা হয়।
আসামীদের হেফাজত থেকে লুন্ঠিত ইজিবাইক, মিশকাতের লুন্ঠিত মোবাইল ফোন সহ সর্বমোট ০৮টি মোবাইল ফোন এবং ইজিবাইক বিক্রির নগদ ৩,৪০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মূল আসামী আকাশ, জিয়া, সিরাজুল ও আখতার স্বীকার করেছে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট হিসেবে সক্রিয়। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা এবং পাবনা জেলা জুড়ে প্রতিনিয়ত চুরি, দস্যুতা ও ডাকাতির মতো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটন করে আসছিল তারা। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আইনগত প্রক্রিয়া শেষে গ্রেফতারকৃত আসামীদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের এই তড়িৎ ও সফল অভিযানে স্বস্তি ফিরে এসেছে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে।
Email:-todaysomoysangbad@gmail.com
Copyright © 2026 টুডে সময় সংবাদ. All rights reserved.