প্রেম, ভক্তি, আধ্যাত্মিকতা, চোখের পানি আর হাজারো মানুষের ভালোবাসায় মুখরিত এক মহা মিলনমেলার মধ্য দিয়ে শেষ হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভুবন বড়ধুলিয়া আব্দুল্লাহ শাহ (রহ.)-এর তিন দিনব্যাপী উরস মোবারক।
গত বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই পবিত্র উরস শনিবার দিবাগত রাতে জিকির, দরুদ, কোরআন তেলাওয়াত, মিলাদ ও আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। আখেরি মোনাজাতের সময় মাজার প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী পরিবেশের সৃষ্টি হয়। হাজারো ভক্ত দুই হাত তুলে, চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে দেশ, জাতি, মুসলিম উম্মাহ ও সারা বিশ্বের শান্তি, সমৃদ্ধি, সুখ ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করেন। মোনাজাত শেষে অনেককেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখা যায়।
ফখরে বাঙাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.)-এর সুযোগ্য পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ শাহ (রহ.)-কে ভক্ত-অনুরক্তরা ভালোবেসে প্রেম জগতের শাহেনশাহ উপাধিতে স্মরণ করেন।
স্থানীয় মুরুব্বিদের মতে, তিনি ছিলেন এক অনন্য আধ্যাত্মিক সাধক। জীবদ্দশায় তিনি মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকেছেন, ভালোবাসা, মানবতা, ত্যাগ ও সত্যের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর দরবারে ধনী-গরিব, ছোট-বড় — সবার জন্য ছিল সমান ভালোবাসা। তিনি কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না। সেই ভালোবাসার টানেই আজও প্রতি বছর হাজারো মানুষ তাঁর উরসে ছুটে আসেন।
এক ভক্ত বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি বাবার উরস। আগে আমার বাবা আসতেন, এখন আমি আসি, আমার ছেলেও আসে। এটা আমাদের পরিবারের একটা ঐতিহ্য হয়ে গেছে। বাবার দরবারে না আসলে মনটা অশান্ত থাকে।”
প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো ভক্ত, অনুরক্ত, পীর-মাশায়েখ, ওলামায়ে কেরাম ও সাধারণ মুসল্লী ভুবন বড়ধুলিয়ায় সমবেত হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, সিএনজি ও নৌকায় করে ভক্তরা আসেন।
কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের নিয়ে, কেউ একাই। কারো হাতে মানতের গরু, কারো হাতে ছাগল, কেউ নিয়ে এসেছেন শিন্নি, কেউবা ফুল, আগরবাতি ও গোলাপজল। সবার মুখে একটাই কথা — বাবার দরবারে এসে মনটা শান্ত হয়ে যায়।
এক নারী ভক্ত বলেন, “আমি আমার সন্তানের জন্য মানত করে এসেছিলাম। আল্লাহর রহমতে আমার মানত পূরণ হয়েছে। তাই এবার শুকরিয়া আদায় করতে এসেছি।”
আরেকজন তরুণ ভক্ত বলেন, “উরসে এসে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। এটা শুধু উরস না, এটা আমাদের একটা মিলনমেলা।”
*মাজার প্রাঙ্গণে উৎসবের আমেজ, গ্রামীণ মেলায় জমজমাট*
উরসকে ঘিরে পুরো ভুবন বড়ধুলিয়া এলাকা সেজেছিল বর্ণিল সাজে। মাজার প্রাঙ্গণ আলোকিত করা হয় রঙিন আলোকসজ্জায়। রাতের আঁধারে ঝলমলে আলোয় পুরো এলাকা যেন এক স্বপ্নপুরীতে পরিণত হয়েছিল। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, পুরো গ্রামটাই যেন আলোয় ভেসে যাচ্ছে।
উরস উপলক্ষে বসা গ্রামীণ মেলায় ছিল নানা ধরনের দোকানপাট। মিষ্টি, জিলাপি, খেলনা, কাপড়, প্রসাধনী, বাঁশি, বেলুন থেকে শুরু করে ঘর-গৃহস্থালির নানা জিনিসপত্রে জমজমাট ছিল মেলা প্রাঙ্গণ। শিশু থেকে বৃদ্ধ — সব বয়সের মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল পুরো এলাকা।
মেলায় আসা এক দোকানি বলেন, “প্রতি বছর এই উরসের অপেক্ষায় থাকি। এই তিন দিনে যা বেচাকেনা হয়, তা দিয়ে অনেক দিন চলে। এবার ভিড়ও বেশি হয়েছে, বেচাকেনাও ভালো হয়েছে।”
মেলায় ঘুরতে আসা এক শিশু হাসিমুখে বলে, “আমি বেলুন কিনেছি, জিলাপি খেয়েছি। খুব মজা লেগেছে।”
তিন দিনই মাজার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত খ্যাতনামা আলেমগণ ওয়াজ করেন। তাঁরা হযরত আব্দুল্লাহ শাহ (রহ.)-এর জীবনী, ইসলামের শিক্ষা, মানবতা, নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম ও পরকাল নিয়ে আলোচনা করেন।
ভক্তরা গভীর মনোযোগ দিয়ে ওয়াজ শোনেন। অনেকেই ওয়াজ শুনে চোখের পানি ফেলেন। রাতভর জিকিরের ধ্বনিতে মুখরিত ছিল মাজার এলাকা। “আল্লাহু, আল্লাহু” জিকিরের সুরে যেন পুরো এলাকা কেঁপে উঠছিল।
এক আলেম তাঁর বক্তব্যে বলেন, “ওলি-আউলিয়াদের দরবারে আসা মানে তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া। তাঁরা যেভাবে আল্লাহকে ভালোবেসেছেন, আমরাও যেন সেভাবে আল্লাহকে ভালোবাসতে পারি — সেটাই উরসের আসল শিক্ষা।”
এবারের উরসের সবচেয়ে প্রশংসনীয় ও আলোচিত দিক ছিল বাউল গান ও মাদকের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
উরস শুরুর আগেই নাসিরনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহিদুল ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন — উরস চলাকালীন বাউল গান এবং গাঁজা, ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এ ব্যাপারে পুলিশ কোনো ছাড় দেবে না, কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ওসির সেই ঘোষণা শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিন দিনই মাজার এলাকা ও আশপাশে পুলিশের কঠোর নজরদারি ছিল। কোথাও বাউল গানের আসর বসতে দেওয়া হয়নি। মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হয় কঠোর ব্যবস্থা। পুলিশের টহল দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে।
ফলে সম্পূর্ণ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, শান্তি ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে উরস সম্পন্ন হয়। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা, মারামারি কিংবা বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।
ওসি শাহিদুল ইসলাম বলেন, “উরস একটি পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এখানে মাদক ও অশ্লীল গান-বাজনার কোনো স্থান নেই। আমরা চাই, ভক্তরা শান্তিতে জিয়ারত করুক, দোয়া করুক। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।”
উরসে আগত ভক্তরা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে প্রাণভরে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
অনেকেই বলেন, “আগে উরসে এসে বাউল গান আর মাদকের কারণে পরিবেশ নষ্ট হয়ে যেত। পরিবার নিয়ে আসতে লজ্জা লাগত। এবার সেই চিত্র বদলে গেছে। এবার আমরা পরিবার নিয়ে শান্তিতে জিয়ারত করতে পেরেছি।”
আরেকজন ভক্ত বলেন, “উরস মানে তো আল্লাহর ওলির স্মরণ, জিকির, দোয়া। মাদক আর গান-বাজনা দিয়ে তো ওলির সম্মান হয় না। পুলিশের এই কঠোরতায় আমরা খুব খুশি। ভবিষ্যতেও যেন এমন থাকে।”
স্থানীয় এলাকাবাসীও বলেন, এবারের মতো শান্তিপূর্ণ উরস তারা অনেক বছর দেখেননি। প্রশাসন, উরস কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয়দের সম্মিলিত সহযোগিতায় এবারের উরস একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
উরস কমিটির সভাপতি শাহ্ সুফি হযরত সৈয়দ শাহ্ মঈনুল হোসাইন রুহুল আমিন সাহেব বলেন, “আমরা চেষ্টা করেছি ভক্তদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে। খাবার পানি, বসার জায়গা, নিরাপত্তা — সবদিকে খেয়াল রাখা হয়েছে। প্রশাসন আমাদের পাশে থাকায় কাজটা সহজ হয়েছে।”
স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক তরুণ বলেন, “তিন দিন ধরে আমরা ভক্তদের পথ দেখিয়েছি, পানি খাইয়েছি, মাজার পরিষ্কার রেখেছি। বাবার দরবারের খেদমত করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।”
তিন দিনের মিলনমেলা শেষে এখন আবার নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গেছেন ভক্তরা। তবে রয়ে গেছে স্মৃতি, রয়ে গেছে ভালোবাসা, রয়ে গেছে আবার আগামী বছরের অপেক্ষা।
যাওয়ার সময় অনেকের চোখে ছিল পানি। কেউ বলছিলেন, “আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে আগামী বছর আবার আসব।” কেউ বলছিলেন, “বাবা, আবার ডাক দিও।”
ভক্তদের প্রত্যাশা, আগামী বছরও এমন শান্তিপূর্ণ, মাদকমুক্ত ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে ভুবন বড়ধুলিয়া আব্দুল্লাহ শাহ (রহ.)-এর উরস মোবারক। আর এই ধারা অব্যাহত থাকলে নাসিরনগরের এই উরস সারা দেশের জন্য একটি আদর্শ উরস হিসেবে পরিচিতি হয়ে থাকবে।
Email:-todaysomoysangbad@gmail.com
Copyright © 2026 টুডে সময় সংবাদ. All rights reserved.