ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রোগীদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ওষুধ, ডায়ালাইসিসের কন্টেনার, মেডিসিনের বিভিন্ন কার্টন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বাইরে বিক্রি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসপাতালের মেইন মেডিসিন স্টোরের সাবেক ইনচার্জ ফার্মাসিস্ট অনন্ত ফার্মাসিস্ট শহিদুল ইসলাম ও ডায়ালাইসিস শাখার অফিস সহায়ক মোহাম্মদ শহীদসহ আরও অনেকেই এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে ডায়ালাইসিসের কন্টেনার ও মেডিসিনের বিভিন্ন কার্টন বাইরে বিক্রি করে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা করে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেওয়া হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এখন বর্তমানের ইনচার্জ ও একই কায়দায় অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগে আরও জানা গেছে, মেডিসিনের মেইন স্টোরের সিনিয়র স্টোর অফিসারের নিয়ন্ত্রণেই এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ মালামাল সরবরাহ ও সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে সরকারি সম্পদ বাইরে বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাবেক মেডিসিন মেইন স্টোরের ইনচার্জ অনন্ত তার দুর্নীতি ও অপকর্মের দ্বায়ে তাকে বদলি করে দেওয়া হয় বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলায়। সেখান থেকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে তকদিরের মাধ্যমে এখন তিনি জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে কর্মরত আছেন । তার পূর্বের নিশানা এখন আবার চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগে জানা গেছে, অনন্ত ঢামেকে হাসপাতালের মেইন মেডিসিন স্টোরের ইনচার্জ থাকাকালীন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে অঢেল সম্পদ গড়েছেন ফার্মাসিস্ট অনন্ত । তার সাথে সাথে সিন্ডিকেটের সদস্যরাও পিছিয়ে নেই।
অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের সহযোগিতায় বাইরের লোকজনের মাধ্যমে এসব সরকারি মালামাল অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললেও সিন্ডিকেটের মূল ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কেউ আটক হলেও তদন্তের অগ্রগতি ও কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কর্মরত নার্স ও কর্মচারীদের মাধ্যমে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত দামি ওষুধ মেডিসিন স্টোর থেকে সুকৌশলে বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের জিয়া। হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায় দ্বিতীয় মেডিসিন স্টোর স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে নতুন ভবনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, দুটি স্টোরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পারস্পারিক যোগাযোগ ও যোগসাজশের মাধ্যমে সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এছাড়াও হাসপাতালের ডায়ালিসিস বিভাগের রোগীদের সাপ্লাইকৃত কন্টেইনারের ডায়ালিসিসের করা জন্য ব্যবহারিত শেষে খালি কন্টেইনার গুলো ও বিভিন্ন ধরনের মেডিসিনের কাটুন বিক্রি করে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তারা। এভাবেই তারা কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তাদের আরও অভিযোগ, প্রতিটি ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে কর্মরত নার্স ইনচার্জদের মাধ্যমে রোগীর সংখ্যা ইন্ডেন্ট খাতায় উল্লেখ করে মেডিসিন স্টোর থেকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত রোগীর সংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী দেখিয়ে ওষুধের চাহিদা তৈরি করা হয়। উদাহরণ হিসেবে অভিযোগকারীরা জানান, কোনো ওয়ার্ডে ২৫ জন রোগী থাকলেও খাতায় ৪৫ জন এবং ৪০ জন রোগী থাকলেও ৬৫ জন দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এভাবে অতিরিক্ত ওষুধ উত্তোলন করে খাতার মাধ্যমে কিংবা খাতা ছাড়াই স্লিপ ব্যবহার করে সরকারি ওষুধ বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
শুধু ওষুধ নয়, ডায়ালাইসিস শাখার কন্টেনার এবং মেডিসিনের বিভিন্ন কার্টনও বাইরে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব মালামাল বিক্রির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে আয় করা হচ্ছে। অথচ সরকারি সম্পদ বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার পরিবর্তে আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মালামালের স্টক রেজিস্টার, সরবরাহের হিসাব, বিক্রির নথি ও আর্থিক লেনদেন তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর প্রয়োজন হয়। অথচ রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী যদি বাইরে বিক্রি হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, আমি অল্প দিন হয় এসেছি, তবে হাসপাতালের যেসব কর্মচারী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সঙ্গে জড়িত, তাদের বারবার সতর্ক করা হয়েছে। অনেকেই সচেতন হয়েছেন, তবে কেউ কেউ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেননি।
তিনি আরও বলেন, সরকারি ওষুধ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত অপ্রীতিকর। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালের সবার প্রতি তার আহ্বান, কেউ যেন এ ধরনের সুযোগ না নেন। এ বিষয়ে কারও কাছে তথ্য থাকলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। জনগণের স্বার্থে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে অনুরোধ করে অনেক দুর্লভ ওষুধ সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু একটি চক্র সেসব ওষুধ বাইরে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মেডিসিন স্টোরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশের যোগসাজশে হাসপাতাল থেকে লাখ লাখ টাকার সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে পাচার করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, স্টক রেজিস্টার ও আর্থিক হিসাব যাচাই-বাছাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এদিকে মেইন মেডিসিন স্টোরের সাবেক ইনচার্জ ফার্মাসিস্ট অনন্ত সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা না করে সাক্ষাতে কথা বলার আমন্ত্রণ জানান। অন্য অভিযুক্তদের বক্তব্যেও একই সুরে বলছেন তারা।
রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ওষুধ, ডায়ালাইসিসের কন্টেনার ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে বিক্রির অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জাতীয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদুক) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্ত দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
বছরের পর বছর ধরে সরকারি সম্পদ অপব্যবহার ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা কেন দৃশ্যমান নয়? হাসপাতালের মেইন মেডিসিন স্টোরের সিনিয়র স্টোর অফিসারের নিয়ন্ত্রণে থেকে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে কি না, তাও তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি। রোগীদের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
Email:-todaysomoysangbad@gmail.com
Copyright © 2026 টুডে সময় সংবাদ. All rights reserved.