দেশের সর্ববৃহৎ প্রাচীনতম চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ সরকার কর্তৃক মনোনীত করায় সকলস্তরের ডাক্তার, কর্মকর্তা, নার্স ও কর্মচারীদের আনন্দের বন্যা বইছে। গত শুক্রবার সরেজমিনে এই হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, এই প্রাচীনতম হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা সেবা নয়, ভাষা আন্দোলনসহ অনেক ইতিহাসের সাক্ষী।
বর্তমান সরকার স্বাধীনতা পদকে শুধু দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে শেষ করে নাই। এই প্রাচীনতম হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আরও ৪ হাজার বেডের অত্যাধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।
ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতাল জরুরি বিভাগ বৃহৎ আকারের ছোটখাটো অপারেশন, ইসিজি ও এক্স-রে সহ বিভিন্ন জরুরি পরীক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। দৈনিক জরুরি ও বহির্বিভাগে ১০ সহস্রাধিক রোগী চিকিৎসা সেবার জন্য আসে। ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিভাগে সারা দেশ থেকে ঘটনা-দুর্ঘটনাসহ সংকটাপন্ন রোগী আসে। কর্তব্যরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ মেডিক্যাল অফিসারগণ ও নার্স-কর্মচারীরা আগত আহত ও সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। জরুরি বিভাগ আগত রোগী ও আহতদের এমন ভিড় একজন লোকের যাতায়াত করা সম্ভব নয়। হাট-বাজারের মতো জনসমাগম প্রতিদিনে রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত ঘটনা-দুর্ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার আগে। প্রায় একসঙ্গে শুধু আহত ২০ থেকে অর্ধশতাধিক পর্যন্ত উক্ত জরুরি বিভাগে আসে।
এছাড়া অন্যান্য সংকটাপন্ন রোগীর ভিড় লেগেই থাকে জরুরি বিভাগে। এই বিপুলসংখ্যক রোগী ও আহতদের সীমিত জনবল কীভাবে সামাল দিচ্ছে তা চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। কোনো আহত কিংবা কোনো রোগী জরুরি চিকিৎসা সেবার বাইরে থাকছেন না। তাৎক্ষণিক সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। ভর্তি করা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে জরুরি বিভাগ থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওয়ার্ডগুলোতে রোগীদের একই দৃশ্য। কোনো কোনো ওয়ার্ডে একবেডে দুই জন, ফ্লোরে, সব ওয়ার্ডে বারান্দায় সিঁড়ি নিচে, বাথরুমের বারান্দা হলেও রোগীদের ঠাঁই হয়। কোনো রোগীকে দুঃখিত বিছানা খালি নেই বলে সংকটাপন্ন রোগীর অন্যান্য হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে দেন। মাঝে মাঝে সংকটাপন্ন রোগী উক্ত হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে রাস্তায় মারা যায়। সময়মতো চিকিৎসা পেলে এই ধরনের অনেক সংকটাপন্ন রোগী তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পেলে বেচে যেত বলে উক্ত জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, সরকার প্রধান তারেক রহমানসহ মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা কর্মচারীদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সকল স্তরের মানুষের চিকিৎসা সেবা পাওয়ার শেষ ভরসাস্থল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। চাহিদার তুলনা বেড সংখ্যা সীমিত। একইভাবে জনবলের সংকট। সারা দেশ থেকে ঘটনা-দুর্ঘটনায় আহত, অগ্নিদগ্ধ, জটিল ও দুরারোগ্যসহ নানা রোগে আক্রান্তসহ যে কোনো রোগী এই হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত এমনটাই রোগী ও তাদের স্বজনরা মনে করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ঘটনা-দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত, স্পাইনাল কডসহ বিভিন্ন অঙ্গে ইনজুরি, মাথায় টিউমারসহ বড় বড় অপারেশন ও চিকিৎসা সেবা মেঝেতে থেকে রোগীর বিনামূল্যে সুচিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। এই ধরনের কোনো কোনো অপারেশন বেসরকারি হাসপাতালে ৪ থেকে ৫ লক্ষাধিক টাকা কমপক্ষে ব্যয় হতো। কোনো কোনো হাসপাতালে আরও বেশি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডের বারান্দায় ও সিড়ির নিচে বিছানা চিকিৎসাধীন থেকে একই মানের সব ধরনের চিকিৎসা সেবা রোগীরা বিনামূল্যে পেয়ে আসছেন। চাহিদার ৯৫ ভাগ ওষুধ সামগ্রী বিনামূল্যের রোগীরা পাচ্ছেন। পুরাতন হাসপাতাল ভবন, হাসপাতাল-২ ও জরুরি বিভাগের সামনে সাবেক ৩০০ বেডের বার্ন ইউনিটসহ মোট ২৯০০ বেডের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার রোগী চিকিৎসাধীন থাকে। এই হাসপাতালে ৪২টি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। এছাড়াও গাইনি বিভাগের জন্য আলাদা অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। নিউরোসার্জারি, গাইনি ও ক্যাজুয়েলটিসহ সব ধরনের জরুরি অপারেশন ২৪ ঘণ্টাতেই হয়ে থাকে। এ ছাড়াও জরুরি বিভাগ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে।
এ বিভাগে আগত ৯৫ ভাগ রোগীকে ভর্তি করা হয়। কার্ডিয়াক সার্জারি, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রোলিভার, থোরাসিক সার্জারি, ক্যানসার, কিডনিসহ সব ধরনের বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে। অর্থাৎ এ হাসপাতালে এক ছাতার নিচে সব ধরনের চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন রোগীরা।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারিভাবে প্রথম দেশের প্রাচীনতম ও ইতিহাসের সাক্ষী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ মনোনীত করায় এটা বড় অর্জন। তিনি সরকার প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান। ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আনন্দিত। তাদের মধ্যে কাজের উৎসাহ আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
Email:-todaysomoysangbad@gmail.com
Copyright © 2026 টুডে সময় সংবাদ. All rights reserved.