দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ, সহিংসতা রোধ ও বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে মাঠে নামানো সেনাবাহিনীর সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী জুন মাসের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে তাদের ফেরৎ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার (৬ মে) বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইএসপিআরসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জারি করে তৎকালীন সরকার
ওই সরকারের নির্দেশে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। কিন্তু দেশজুড়ে মবসৃষ্টি ও সহিংসতা প্রতিরোধে ইউনূস সরকারের মেয়াদেও সেনাবাহিনী মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ছিল।
তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। দলটি দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভায় সরকার সিদ্ধান্ত নেয় মাঠে থাকা সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। চলতি বছরের মে মাসের শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে দলের ভেতর ও বাইরে জোড়ালো দাবি ওঠে এবং এ নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী জুন মাসের মধ্যেই মাঠে থাকা সব সেনা সদস্যকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ৬ জুন থেকে সেনাসদস্যদের চূড়ান্ত প্রত্যাহার শুরু হবে। প্রথমে দূরবর্তী জেলা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে। পরে ধাপে ধাপে বিভাগীয় শহর ও বড় জেলা থেকেও সদস্যদের ফিরিয়ে আনা হবে। জুন মাসের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে থাকা সব সেনাসদস্য ব্যারাকে ফিরে যাবেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পর মঙ্গলবার কোর কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গত ২১ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, বিজিবি মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ছাড়াও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি দমন, মাদকবিরোধী অভিযান এবং পুলিশের পোশাক পরিবর্তনসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। পরে ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম ব্যাহত হলে সেনাবাহিনী মাঠেই থেকে যায়। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতাও দেয়।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ২০২৪ সালের আগস্টেই বলেছিলেন, পুলিশ পুনর্গঠিত হলে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে। পরবর্তীতে কিছু সদস্যকে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হলেও নির্বাচনের সময় তারা মাঠেই ছিলেন।
বর্তমানে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে প্রায় ১৭ হাজার সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কারণে সদস্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন এবং বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার তাদের প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
বৈঠকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে থাকা কিছু মামলার বিষয়েও আলোচনা হয়। যেসব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নেই, তাদের জামিনে বাধা না দেওয়ার বিষয়ে মত হয়। বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে হয়রানি না করার নির্দেশনাও দেওয়ার কথা জানা গেছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে দেওয়া কিছু আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের গানম্যান প্রদান, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে মামলা এবং মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।



















