সন্ধ্যা সাতটা মাগরিবের আযানের ঠিক পরপর রাস্তায় হাঁটছিল ফারহান। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী। গন্তব্য টিউশন। আচমকা তিন-চারজন অচেনা তরুণ এসে ঘিরে ধরে তাকে। একজন হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, “আরে, এই পোলাই তো! ওই মাইয়াডারে তো এই পোলাই ধর্ষণ করসে! সারাদিন পর খুঁইজা পাইলাম!”
ফারহান স্থানুর মতো জমে গেল। বেশিক্ষণ ভাবতেও পারলো না কিছু। তার আগেই চতুর্দিক থেকে বেধড়ক মার পড়তে লাগলো চোখে, নাকে, মুখে। এলোপাথাড়ি আঘাত হাত দিয়ে ঠেকাতে চেষ্টা করে ওঠার আগেই রডের জোরালো আঘাত পড়লো মাথায়। এরপর লাঠি আর লাথির যুগপৎ প্রহার। জুতাও ছুঁড়ে মারলো অনেকে। মাথার কাছ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়া টের পেলো সে অজ্ঞান হবার ঠিক আগে। অর্ধ শতাধিক মানুষ যোগ দিলো এই ‘ধর্ষক-প্রহার’ কার্যক্রমে। কেউ একবার ফারহানের কথা শুনতে চাইলো না। কিছু মানুষ স্রেফ মুঠোফোন থেকে লাইভ-স্ট্রিমিং শুরু করলো। এতে উপকার যা হলো- ফারহানের দুই বন্ধু ভাইরাল হওয়া এক ‘লাইভ’ দেখে দ্রুত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে এলো, কিন্তু তবুও ঘণ্টা দুয়েক দেরী হয়ে গেছে। চিকিৎসক জানালেন, ফারহানের মস্তিষ্কে একটি স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে। চোখের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
মধ্যরাতে জানা গেল, হামলাকারী এক তরুণ আটক হয়েছে এবং ক্লাসরুমের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরেই ফারহানের এক সহপাঠী ধর্ষণের মিথ্যা রটনা রটিয়ে তার উপর হামলা করিয়েছে। অবশ্য ততক্ষণে বেশ ক্ষতি হয়ে গেছে। এখন শারীরিক আঘাত, মানসিক ট্রমা আর সামাজিকভাবে হেয় হবার ক্ষত নিয়েই কাটবে তার জীবন। এর পেছনে কাজ করছে স্রেফ দুই শব্দের একটি উন্মাদনা- ‘মব জাস্টিস’। অক্লোক্রেসি বলে অ্যাকাডেমিক ভাষায়।
পাঠকের কী মনে হয়? এটি নিতান্তই উর্বর মস্তিষ্কের এক কল্পনা? না। রূঢ় বাস্তবতাটি হলো, আজকের বাংলাদেশের চিত্র অনেকটা এমনই। অসহিষ্ণুতা, মানসিক অস্থিরতা আর সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের প্রভাবে মানুষ তার আশেপাশের অন্য মানুষকেই সহ্য করতে পারছে না। কিছু হলেই দলবল নিয়ে হামলে পড়ছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এ যেন এক ‘কালেক্টিভ হিস্টিরিয়া’! এরই ফলশ্রুতিতে উপরোক্ত ঘটনার মতো ঘটনা ঘটেই চলেছে আমাদের চারপাশে, আমাদের জ্ঞাতে কিংবা হয়তো অজ্ঞাতসারেই। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ‘মব জাস্টিস’ এক াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘ধর্ষণের অভিযোগ’ উঠলে তার আর রেহাই নেই। সমাজের একটি বড়ো অংশ মুহূর্তের মধ্যেই বিচারক এবং জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। একদিকে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক ক্ষোভ থাকাটা স্বাভাবিক, অন্যদিকে সেই ক্ষোভকে পুঁজি করে বিনা বিচারে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা বা পঙ্গু করে দেওয়া এক
মধ্যযুগীয় বর্বরতা। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আজ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকার চরম সংকটের মুখোমুখি।
আমরা এটি নিশ্চয়ই মানি যে, বাংলাদেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেবার অভিযোগ নতুন নয়। চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির অভিযোগে এদেশের মানুষ প্রায়শই গণপিটুনির আয়োজন (!) করে। কিন্তু আজকাল পরিস্থিতি ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তৃতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনাস্থা, বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার হতাশা, সর্বোপরি যথাযথ আইনের শাসনের অভাবের কারণে মানুষ এখন গুজবকে গ্রহণ করে নেয় খুব সহজে। অনলাইনে কারো চরিত্রহানি করে সহজেই তার নামে নিকৃষ্ট ধর্ষণের অভিযোগ দিয়ে দেওয়া যায়। এরপরই শুরু হয় প্রমাণ ছাড়া ধর্ষণের শাস্তি কার্যকরের যাবতীয় ‘স্বেচ্ছাসেবী’ প্রক্রিয়া। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে ‘ধর্ষণের অভিযোগ’ তুলে হিংস্র হয়ে ওঠা জনতার রোষানলে ফেলার চর্চা ইদানীং আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কেউ জানতেও আগ্রহী নয়, মূল ঘটনা কী ছিলো।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মব
জাস্টিসের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও জনাকীর্ণ
এলাকায় জনসমক্ষে দলবদ্ধ হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে
দাঁড়িয়েছে। ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো গুরুতর। বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে
ঝুলে থাকা ধর্ষণ মামলা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর না হওয়ার কারণে জনগণের
মধ্যে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদী হতাশা ডালপালা মেলেছে। এ থেকে তাদের এক প্রকার বদ্ধমূল
ধারণা জন্মেছে যে, আইনের স্বাভাবিক গতিতে বিচার পাওয়া যাবে না। অতএব, অকুস্থলে বিচার
সম্পন্ন করাই কর্তব্য। এই সহিংস চিন্তাধারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে গভীর নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে
দিচ্ছে। যেকোনো সময় যেকেউ মবের স্বীকার হতে পারেন, অবস্থা এমন হয়ে পড়েছে।
যথাযথ আইনের শাসন ও সংবিধানস্বীকৃত নাগরিকের মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন, পাশাপাশি জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের লঙ্ঘনও এই সংকটের জন্য দায়ী। যদিও বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনে স্পষ্টভাবে মব জাস্টিসকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তবুও এর প্রায়োগিক দিক নিয়ে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যেকোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার। আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।
অন্যদিকে, আদালতে কেউ দোষী প্রমাণিত না হওয়া অবধি সে নির্দোষ- বাংলাদেশে বিদ্যমান ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এই কথাই বলে। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১১ নং অনুচ্ছেদেও এমনটি বলা আছে। অথচ মব করার সময় ‘দোষী’ বানাতে কোনো যথার্থ প্রমাণ লাগে না।
বাংলাদেশের আইনের শাসনের হাওয়া মাঝেমধ্যেই সুবাতাস দেয়। চমৎকার সব আইন ও নীতি তখন গৃহীত হয়। কিন্তু সবটা ওই গৃহীত হওয়া পর্যন্তই। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০)’ তেমনই একটি কঠোর আইনি কাঠামো। এর অধীনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। এই আইনের কঠোরতার কারণে প্রায়ই ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক শত্রুতার জেরে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। তবে তা আর আদালত পর্যন্ত যেতে পারে না, মব জাস্টিসের কারণে সত্যতা যাচাইয়ের আগেই একজন মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। এছাড়াও, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা মোতাবেক গণপিটুনিতে কারো মৃত্যু হলে তা হত্যাকাণ্ড হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
মব জাস্টিস মানুষের ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার’ (Right to be heard) কেড়ে নেয়। একজন প্রকৃত অপরাধীরও আদালতে নিজের পক্ষে কথা বলার এবং আইনি লড়াই করার অধিকার রয়েছে। সংবিধানের ৩৫ নং অনুচ্ছেদে এই সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের বাইরে বাংলাদেশ সরকারের অনুসমর্থিত ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি’-র ধারা ৬, ৭, ৯ ও ১৪ অভিযুক্তের পক্ষে এই অধিকারকে সুরক্ষিত করে। আবার অনেকে ইসলামের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ টানতে চান, অথচ সেখানেও মানবাধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে অপরাধের সাক্ষ্যপ্রমাণের কথা উচ্চারিত হয়েছে। তাই কোনোভাবেই মব জাস্টিসকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়, এতে প্রকৃত অপরাধ আড়াল হবার সুযোগ তৈরি হয়।
ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের কঠোর শাস্তি বিধান করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য নৈতিক দায়িত্ব। তবে আইনের বাইরে গিয়ে সাধারণ জনতা যখন রোষের বশবর্তী হয়ে এর শাস্তি বিধান করতে যায়, তা এক সহিংস, অরাজক, অন্ধ সংস্কৃতিকে ইঙ্গিত করে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার বিগত সরকারের সাইবার আইনের মতোই এটিকে হাস্যকর বানিয়ে দিচ্ছে। সত্যিকার বিচারপ্রার্থীরা হচ্ছেন এর নির্মম শিকার। শেষ করব ঈশপের সেই বিখ্যাত রাখাল বালকের গল্প দিয়ে। বারংবার নেকড়ে আসার মিথ্যা কাহিনি শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিয়েছিলো। ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের মিথ্যা গল্পের বলিও যেন সত্যিকার বিচারপ্রার্থী মানুষেরা না হন। আমি কিংবা আপনিও যেন রাস্তায় হঠাৎ মার খেয়ে রাতুলের পরিণতি না বরণ করি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে এটুকু বোধহয় সামান্য চাওয়া!
আবদুল্লাহ আল নোমান
ইন্টার্ন, অ্যাপ্লাইড ডেমোক্রেসি ল্যাব এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



















