পাকিস্তানের বিপক্ষে সিলেটের মাঠে চলমান টেস্টে অনন্য এক কীর্তি গড়লেন অভিজ্ঞ টাইগার ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। টেস্ট ক্যারিয়ারের দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি তুলে নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে টেস্ট সংস্করণে এককভাবে সর্বোচ্চ শতকের মালিক এখন তিনি।
এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে টেস্ট ক্রিকেটে মুশফিকের মোট শতকের সংখ্যা দাঁড়াল ১৪টিতে। এর আগে ১৩টি সেঞ্চুরি নিয়ে বাঁহাতি ব্যাটার মুমিনুল হকের সঙ্গে যৌথভাবে তালিকার শীর্ষে ছিলেন তিনি। পাকিস্তানের বোলারদের সামলে সেই রেকর্ডটি সম্পূর্ণ নিজের করে নিলেন এই ‘ডিপেন্ডেবল’ ব্যাটার।
চলমান টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আরও একটি বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মুশফিক। তিন সংস্করণ (টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি) মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৬ হাজার রানের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করেছেন তিনি। ইনিংসের ৭৩তম ওভারের তৃতীয় বলে দুই রান নেওয়ার সাথে সাথেই এই মাইলফলকে পৌঁছান তিনি।
সোমবার তৃতীয় দিনের সকালে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে কঠিন সময় পাড়ি দেন মুশফিক। তবে শান্ত বেশিক্ষণ টেকেননি, এরপর লিটনকে নিয়ে শুরু হয় মুশফিকের নতুন পথচলা। যেখানে ১২৩ রানের জুটিতে মুশফিক ছিলেন একইসঙ্গে ধৈর্যশীল ও প্রজ্ঞাবান। লিটন দাস যখন নিজের স্ট্রোকপ্লের শিল্পে ম্যাচকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মুশফিক ছিলেন দৃঢ়, সংযত এবং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত।
লিটন আউট হওয়ার পরও ইনিংসের গতি থামতে দেননি মুুুুুশফিক। পরিস্থিতির দাবি বুঝে তখন নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে এগিয়ে নেন ইনিংস। পরে তাইজুল ইসলামের সঙ্গে তার অবিচ্ছিন্ন জুটিও পেরিয়ে যায় পঞ্চাশ। ৮২ বলে আসে সেই ফিফটি পার্টনারশিপ। প্রতিটি রান তখন পাকিস্তানকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছিল ম্যাচ থেকে।
মুশফিকের এই ইনিংসের সৌন্দর্য ছিল তার নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনে। তিনি কখন ধীর হবেন, কখন গতি বাড়াবেন, কখন ঝুঁকি নেবেন— সবকিছু যেন পরিস্থিতির প্রয়োজন মেপে ঠিক করেছেন। ১৭৮ বলে পৌঁছান তিন অঙ্কে। তখন তার ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও একটি ছক্কা। অপরপ্রান্তে তাইজুল ইসলাম ছিলেন ৩২ বলে ১১ রানে। স্কোরবোর্ড বলছিল শতকের গল্প, কিন্তু ম্যাচের ভেতরের গল্প বলছিল এক অভিজ্ঞ ব্যাটারের ক্রিকেটবোধের কথা।
এই শতকের মধ্য দিয়ে মুমিনুল হককে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ১৪ সেঞ্চুরির মালিক এখন মুশফিকুর রহিম। চলতি সিরিজের প্রথম টেস্টে মুমিনুলের সামনে সুযোগ ছিল তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু ৯১ রানে আউট হয়ে সেই সুযোগ হাতছাড়া করেন তিনি। মুশফিক সেই ভুল করেননি।
৯৯ থেকে সেই এক বাউন্ডারিতে এককভাবে উঠে যান বাংলাদেশের টেস্ট সেঞ্চুরির শীর্ষে। তিন সংস্করণ মিলিয়ে মুশফিকের এটা ২৩তম সেঞ্চুরি। তার চেয়ে বেশি সেঞ্চুরি আছে কেবল তামিম ইকবালের ২৫টি।
তবে এই ইনিংসকে কেবল সেঞ্চুরি দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। কারণ একইসঙ্গে আরেকটি ইতিহাসও গড়েছেন তিনি। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৬ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মুশফিকুর রহিম।
দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিন সংস্করণ মিলিয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি আগে থেকেই তার দখলে ছিল। যা আজ আরও সমৃদ্ধ হলো।
এর আগে ৬১তম ওভারে টেস্ট ক্যারিয়ারের ৩০তম ফিফটি তুলে নেন মুশফিক। এই মাসের ২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার ২১ বছর পূর্ণ হবে। ৩৯ বছর বয়সে এসেও নিজের ফর্ম ঠিকই ধরে রেখেছেন এই অভিজ্ঞ টাইগার ব্যাটার।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসেও নতুন এক অধ্যায় লিখেছেন মুশফিক। ৩৯ বছর ৭ দিন বয়সে শতক করে তিনি এখন ডব্লিউটিসির সবচেয়ে বয়স্ক সেঞ্চুরিয়ান। ক্রিকেটের ভাষায় যাদের বলা হয় “ওল্ড গার্ড”, তারা এখনও মঞ্চ ছেড়ে যায়নি— মুশফিক যেন আবারও সেটিই মনে করিয়ে দিলেন। এই ইনিংসকে আরও বড় করে তোলে তার ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপট। ২১ বছর ধরে টেস্ট খেলছেন তিনি। ম্যাচ সংখ্যা মাত্র ১০২। তুলনায় বিরাট কোহলি ১৪ বছরে খেলেছেন ১২৩ টেস্ট, অ্যালিস্টার কুক ১২ বছরে ১৬১। এমনও সময় গেছে, বাংলাদেশ বছরে পাঁচ-ছয়টির বেশি টেস্টই খেলেনি। দীর্ঘ আট মাস টেস্টবিহীন থেকেছে দল। মুশফিক নিজেও ক্যারিয়ারে বছরে গড়ে পাঁচটির কম টেস্ট খেলেছেন। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তার ৭৩০০-এর বেশি রান আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে।
কারণ ক্যারিয়ারের শুরুতে বাংলাদেশও টেস্ট ক্রিকেটের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না, মুশফিক নিজেও না। একসময় যার গড় ছিল বিশের আশেপাশে, সেই মুশফিক আজ প্রায় চল্লিশ গড়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা টেস্ট ব্যাটার। এই ধারাবাহিকতার পেছনে প্রতিভার চেয়ে বড় ছিল তার ডেডিকেশন। ফিটনেসের প্রতি নিষ্ঠা। নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। এই ইনিংসেই যেমন বিভিন্ন পার্টনারশিপ মিলিয়ে প্রায় ৪০০ বল ধরে উইকেটে ছিলেন তিনি। ৩৯ বছর বয়সেও যে ক্ষুধা, যে মনোযোগ, যে শ্রম তিনি দেখান, সেটিই তাকে আলাদা করে দেয়। তাই আফসোসও জন্ম নেয়। যদি বাংলাদেশ আরও বেশি টেস্ট খেলত? যদি ক্যারিয়ারের শুরুর বছরগুলোতে এই দল আরও প্রস্তুত থাকত? যদি বছরে দশ-বারোটি টেস্ট খেলার সুযোগ পেতেন? তাহলে হয়তো আজ মুশফিক ১০ হাজার রানের ক্লাবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেই ক্লাব, যার দরজা খুলেছিলেন সুনীল গাভাস্কার। পরে যেখানে যোগ দিয়েছেন অ্যালান বোর্ডার, স্টিভ ওয়াহ, শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, শিবনারায়ণ চন্দরপল, রিকি পন্টিংদের মতো মহারথীরা।
স্বপ্নটি এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ মুশফিকের শরীরের চেয়েও তার ইচ্ছাশক্তি যেন বেশি তরুণ। আরও তিন বছর যদি খেলতে পারেন, কে জানে— হয়তো একদিন সত্যিই ১০ হাজারি ক্লাবের দিকেও হাঁটবেন তিনি।
বাংলাদেশি ক্রিকেটে বহু প্রতিভাবান ব্যাটার এসেছে, বহু স্টাইলিশ ইনিংসও দেখা গেছে। কিন্তু নির্ভরতার সংজ্ঞা লিখতে গেলে যে নামটি সবচেয়ে আগে আসে, তিনি মুশফিকুর রহিম। এই বয়সেও যিনি দলকে বাঁচানোর জন্য, এগিয়ে নেওয়ার জন্য, ইতিহাস লেখার জন্য নিজেকে নিংড়ে দিতে জানেন। সেই কারণেই তার নামের পাশে এতদিন পরও একই অভিধা মানিয়ে যায় সবচেয়ে বেশি— মিস্টার ডিপেন্ডেবল।
মুশফিকুর রহিমের অনবদ্য সেঞ্চুরিতে পাকিস্তানকে শাসন করেছে বাংলাদেশ। সবমিলিয়ে অলআউট হওয়ার আগে বাংলাদেশ করেছে ৩৯০ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ লিড নিয়েছে ৪৩৬ রান। ফলে ৪৩৭ রান করতে হবে পাকিস্তানকে জিততে।
সিলেটে তৃতীয় দিন শেষ ব্যাটার হিসেবে ১৩৭ রান করে আউট হয়েছেন মুশফিক। সাজিদ খানকে বড় শট খেলতে গিয়ে মিড উইকেটে ক্যাচ দেন মোহাম্মদ আব্বাসকে। তিনই আউট হলে অলআউট হয় স্বাগতিকরা। অন্যপ্রান্তে ০ রানে অপরাজিত ছিলেন নাহিদ রানা।
লিটন দাসের সঙ্গে মুশফিকের জুটি হয় ১২৩ রানের। এই জুটিই ম্যাচের ভিতটা গড়ে দেয়। ৬৯ রানে হাসান আলীর বলে তিনি বিদায় নিলে ২৩৮ রানে ৫ উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। ১৯ রানের বেশি করতে পারেননি মেহেদি হাসান মিরাজ। তবে তাইজুল বেশ ভালো সাপোর্ট দেন মুশফিককে। আউট হওয়ার আগে তিনি করেন ২২ রান। মুশফিকের সঙ্গে তার জুটি হয় ৭২ রানের। ৭ উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
তাসকিন ৬ ও শরিফুল করেন ১২ রান। তবে একপ্রান্তে অবিচল থাকা মুশফিক তুলে নেন ক্যারিয়ারের ১৪তম টেস্ট সেঞ্চুরি, যা কি না বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে কোনো ব্যাটারের একক সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির সংখ্যা। টপকে গেছেন ১৩ সেঞ্চুরি মালিক মুমিনুল হককে। ১৩৭ রানের ইনিংসটি মুশফিক সাজিয়েছেন ১২ চার ও এক ছক্কায়।
তৃতীয় দিনের শুরুতে আউট হয়েছেন শান্ত। ১৫ রানের বেশি করতে পারেননি তিনি। খুররম শাহজাদের বলে সাজঘরে ফেরেন তিনি লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে। আর প্রথম দিন তানজিদ হাসান তামিম ৪ ও মুমিনুল আউট হন ৩০ রান করে। ওয়ানডে মেজাজে ৫২ রান করে আউট হন মাহমুদুল হাসান জয়।
বিনা উইকেটে ০ রান নিয়ে তৃতীয় দিন শেষ করেছে পাকিস্তান। টেস্টে সর্বোচ্চ ৪১৮ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।
পাকিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ ৪ উইকেট পেয়েছেন খুররম শাহজাদ। ৩টি সাজিদ খান, দুটি হাসান আলী ও একটি পেয়েছেন মোহাম্মদ আব্বাস।



















