রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে উঠতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়া ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের যাত্রীবাহী বাসটি টেনে তোলা হয়েছে। বাসটি উপরে তোলার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক মরদেহ বেরিয়ে আসছে।
এখন পর্যন্ত বাসের ভেতর ও নদী থেকে নারী ও শিশুসহ ১৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে, স্থানীয়রা ১১ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। এখনও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর থেকে নিখোঁজদের খোঁজে ফেরিঘাটে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। স্বজনদের আহাজারিতে পদ্মাপাড়ের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে বুধবার দিবাগত রাত ১ টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান জানিয়েছেন বাসডুবির ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার ও আহতদের পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে যাত্রীবোঝাই ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
এতে মুহূর্তে বাসটি ৯০ ফুট গভীর পানির নিচে তলিয়ে যায়। তাৎক্ষণিক ৬/৭ সাঁতার কেটে স্থানীয়দের সহায়তা জীবিত অবস্থায় উপরে উঠে আসতে সক্ষম হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত দুজনের মরদেহ উদ্ধার ও আরও একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও উদ্ধারকর্মীরা। পরে তারা নদীতে নিমজ্জিত বাসটি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর ঘটনাস্থলে খবর দেওয়া হয় উদ্ধারকারী জাহাজ হামজাকে। কিন্ত বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার কাজের চরম ব্যাহত হয়।
পরবর্তীতে নদীতে তল্লাশি চালিয়ে ভেসে ওঠা বেশ কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস ও নৌ বাহিনীর দল। রাত পৌনে ১২টার দিকে নদীর পানির নিচে থাকা বাসটির সামনের অংশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় একের পর এক মরদেহ বের করে আনেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সদস্যরা।
ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের কমান্ডার মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের দুজন ডুবুরি ও দুজন সহকারী ডুবুরি উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে নৌবাহিনীর একটি ডুবুরি দলও উদ্ধার কাজ অংশগ্রহণ করেন।
দৌলতদিয়া ঘাট সূত্র জানায়, কুষ্টিয়ারা কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ফেরি ঘাটের পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটি যেখানে পড়েছে সেখানে অত্যন্ত গভীর। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের কাছে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ডুবন্ত বাস বা কোনো যাত্রীকে উদ্ধার করতে পারেনি।
একটি সূত্র জানায়, দুপুর দুইট ১০ মিানিটে কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা বাসটিতে ৫৬ থেকে ৬০ জন যাত্রী ছিলো। যাদের বেশির ভাগই ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় কর্মস্থলে ফিরছিল।
রাজীব নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, গভীর রাত ২টা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ১৯ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। মারাত্মক আহতাবস্থায় সাতজনকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। বাকিরা এখনও নিখোঁজ। তাদের খোঁজে স্বজনদের আহাজারিতে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ও পদ্মাপাড়ের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
জানা গেছে, বাস নদীতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত ৩৫/৪০ জন যাত্রী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
পদ্মার পাড়ে ছোট বোন ফাতেমা তুজ জোহরা ও জামাই কাজী সাইফ আহমেদের খোঁজে এসেছেন রোকন। তিনি বলেন, আমার বন্ধুর ছোট বোন ও তার জামাই বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার বাসে রাজবাড়ী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনে ঢাকায় যাচ্ছিল। পরে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দৌলতদিয়ার পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়। আমরা সাড়ে পাঁচটার দিকে সংবাদ পাওয়ার পর দৌলতদিয়া ঘাটে এসেছি। কিন্তু আমার ছোট বোন ও তার জামাইয়ের এখনও সন্ধান পাইনি। তাদের অপেক্ষায় আমরা রয়েছি।
শরিফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বলেন, রাজবাড়ী থেকে আমার স্ত্রী, ছেলে সন্তান, মেয়ে সন্তান, ভাগনি ও ভাগনির ছেলে সৌহার্দ্য পরিবহন বাসে ওঠে। ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী, মেয়ে ও ভাগনি স্থানীয়দের সহযোগিতায় সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও আমার সাত বছরের ছেলে সন্তান ও এগারো বছর বয়সের ভাগনে এখনও নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা আসলেও এখনও উদ্ধার অভিযান শুরু করেনি। আমার ছেলে ও ভাগনেতো আর নেই, এখন তাদের মরদেহ আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হোক।
এদিকে উদ্ধার অভিযানের মধ্যেই পদ্মা পাড়ে আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বর্তমানে প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস বইছে এবং বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বৈরি আবহাওয়ার কারণে নদীর উত্তাল ঢেউ ও অন্ধকারে উদ্ধার কাজ চালাতে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের।
এদিকে এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবার (২৫ মার্চ) রাতে জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার স্বাক্ষরিত এক পত্রে এ তথ্য জানানো হয়। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উছেন মেকে আহ্বায়ক ও গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাসকে সদস্যসচিব করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্), বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স উপ-সহকারী পরিচালক।
তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্তপূর্বক আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার ও আহতদের পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত ১৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো অনেকে নিখোঁজ। উদ্ধার অভিযান বন্ধ হবে না। নদীর অনেকখানি জায়গাজুড়ে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাপস কুমার জানান, বাসটিতে আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ জন যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১১ জনকে জীবিত এবং গভীর রাত পর্যন্ত ডুবে যাওয়া বাসের ভেতর ও নদীতে ভেসে ওঠা ১৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
এদিকে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, প্রায় ৭ ঘণ্টা চেষ্টার পর ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করা হয়েছে। বাসে ঠিক কতজন ছিলেন সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে অনেকে এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। নিহত ১৯ জনের মধ্যে ১৪ জন নারী ও পাঁচজন পুরুষ।



















