টুডে সময় সংবাদ Today Somoy Sangbad - গণমানুষের কণ্ঠস্বর
Thursday , 23 April 2026 | ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার ভয়ঙ্কর ক্রাইম জোন”মোহাম্মদপুর-আদাবর” নিত্যঘটনা খুনাখুনি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি, সক্রিয় অন্তত ২ ডজন কিশোর গ্যাং গ্রুপ

প্রতিবেদক
এস এম দেলোয়ার হোসেন
April 23, 2026 8:57 am

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর নানা ইস্যুতে ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকার ক্রাইম জোন হিসেবে খ্যাত “মোহাম্মদপুর”। রাতের আধারে এই বিস্তর্ণ জনপদের এক-একটি এলাকায় গড়ে উঠেছে অপরাধের সাম্রাজ্য। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাহাজানি, দস্যুতা আর তুচ্ছ ঘটনায় অনাকাঙ্ক্ষিত খুনোখুনি যেন নিত্যঘটনায় পরিণত হয়েছে। এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গড়ে উঠেছে অন্তত দুই ডজন কিশোর গ্যাং গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অব্যাহত অভিযানেও এসব অপরাধীর দৌরাত্ম্য থামছেই না। বরং সিসিটিভি ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই মাদকের কারবার আর চাঁদা তোলার মহোৎসব চলছে। অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর পুলিশ যে ট্রমায় রয়েছে, এখনও তারা ঘুরে দাঁড়াতেই পারেনি। সেই সুযোগটি লুফে নিয়ে আধিপত্য বিস্তার ঘটিয়েছে অপরাধীরা। এদের রাজনৈতিক দলের মদদও রয়েছে। তবে শুধু মোহাম্মদপুর নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীদের তালিকা তৈরি করে পুলিশের বিশেষ এ অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। এদের গতিবিধি অনুসরণে আরও নজরদারি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে অভিভাবক ও সমাজের সচেতন মহলকেও আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। পুলিশ বলছে, অপরাধীদের লাগাম টেনে ধরতে নিয়মিত অভিযান চলছে। অনেককেই আটক করে বিধি মোতাবেক আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। তবে আইনের মারপ্যাঁচে ফাঁক গলিয়ে জামিনে ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে ওরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এদের অপরাধ দমনে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় সন্ধ্যার পর পালটে যায় এলাকার চিত্র। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, সব জায়গাতেই সক্রিয় ছিনতাইকারীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা ও কয়েক হাজার গ্রেফতারের পরেও অপরাধ কমছে না, বরং এলাকাটি অপরাধের ‘হটস্পট’ হিসেবে রয়ে গেছে। এলাকায় ঘুরে দেখা যাবে, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার প্রধান সড়ক থেকে পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে ভীতিকর পরিবেশে চুকিয়ে আড্ডা দিচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। দেখলে মনে হবে অপরাধীদের কাছে “মোহাম্মদপুর-আাদবর” যেন মগের মুল্লুকের জনপদ।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোর নেতৃত্ব ও আনুগত্যে পরিবর্তন আসে । কেউ দল বদল করেছে । কেউ নতুন নেতৃত্বে যুক্ত হয়েছে । অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগে গড়ে ওঠে এসব নতুন নতুন গ্যাং। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। গ্যাংগুলোর নিজেদের সংঘর্ষ, শক্তি প্রদর্শন এবং প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের সিসিটিভি ফুটেজ জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত এক বছরে কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৫ জনের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, সব জায়গাতেই সক্রিয় ছিনতাইকারীরা। বিশেষ করে রিকশাযাত্রী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ তাদের প্রধান টার্গেট। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সময় মোবাইল ফোন, ব্যাগ ও ল্যাপটপ ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর পুলিশ যে ট্রমায় রয়েছে, এখনও তারা ঘুরে দাঁড়াতেই পারেনি। সেই সুযোগটি লুফে নিয়ে আধিপত্য বিস্তার ঘটিয়েছে অপরাধীরা। এদের রাজনৈতিক দলের মদদও রয়েছে। তবে শুধু মোহাম্মদপুর নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীদের তালিকা তৈরি করে পুলিশের বিশেষ এ অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। এদের গতিবিধি অনুসরণে আরও নজরদারি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে অভিভাবক ও সমাজের সচেতন মহলকেও আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।

পুলিশ বলছে, অপরাধীদের লাগাম টেনে ধরতে নিয়মিত অভিযান চলছে। অনেককেই আটক করে বিধি মোতাবেক আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। তবে আইনের মারপ্যাঁচে ফাঁক গলিয়ে জামিনে ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে ওরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এদের অপরাধ দমনে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অ্যালেক্স ইমন গ্রুপের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ছিনতাইয়ে বাধা পেলে কুপিয়ে জখম করতেও দ্বিধা করে না তারা। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গ্যাংগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দুই গ্যাংয়ের সংঘর্ষে দুজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। ইমন একটি বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করার পর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বলে জানা গেছে ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জুয়েল রানা জানান, ইমন হত্যার ঘটনায় তার মা মোছা. ফেরদৌসী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত আসামি সুমনসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরমান শাহরুখ গ্রুপের সদস্যদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ইমনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৮টি মামলা রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত তিন হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মোহাম্মদপুরে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে ‘কবজি কাটা গ্রুপ’ সবচেয়ে আলোচিত ছিল। ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। গ্রুপ প্রধান আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের তৎপরতা কিছুটা কমে। তবে অ্যালেক্স ইমন গ্রুপ বেশি সক্রিয় ছিল। এছাড়া পাটালি গ্রুপ, বেলচা মনির, টুন্ডা বাবু, লও ঠেলা, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসান ও ‘চেতাইলেই ভেজাল’ নামে পরিচিত আরও কয়েকটি গ্যাংয়ের অস্তিত্বের কথা জানিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানান, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক অপরাধীকে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো ছোরা-চাপাতি এবং সামুরাইসহ গ্রেফতার করে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ শেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে অনেককেই কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ জামিনে ছাড়া পেয়ে নিজ এলাকায় ফিরে এসেছে। তবে চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত আসামিদের বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের গতিবিধি অনুসরণের মাধ্যমে অপরাধ দমনে আবারও গ্রেফতারে তৎপর রয়েছে থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থার সদস্যরা।

সর্বশেষ - অপরাধ