রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- এর ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুর সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও তিনি পুনরায় পদ ফিরে পেতে ক্যাম্পাসজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কাজে গাফিলতি, আর্থিক অনিয়ম এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। তবে বরখাস্ত হওয়ার পরও তিনি প্রভাব খাটিয়ে পদ ফিরে পেতে বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকলেও আবদুল গফুর পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। তার বিরুদ্ধে অবকাঠামো নির্মাণে অনিয়ম, প্রশ্নবিদ্ধ দরপত্র প্রক্রিয়ায় অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ লেনদেন, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, সরকারি অর্থ দ্বৈতভাবে উত্তোলন, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং অযৌক্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন তার স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে নোটিশ দিলেও তিনি তা আমলে নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা জীবনে দুটি তৃতীয় বিভাগ থাকা সত্ত্বেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান। চাকরির শর্ত অনুযায়ী সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলেও ২০১৭ সালের ১০ জুলাই সরাসরি সপ্তম গ্রেডে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের সহকারী পরিচালক পদে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তিনি নিয়োগ পান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্রে দেখা গেছে, ট্রেনিং ও মিটিংয়ে অংশগ্রহণের নামে কর্মচারীদের নামে অগ্রিম বিল উত্তোলন করে পরে তা সমন্বয় দেখানো হতো। একই সঙ্গে তিনি ডিএও গ্রহণ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, একই খাতে একাধিকবার বিল দেখিয়ে প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, নিয়মবহির্ভূতভাবে কর্মচারীদের নামে অগ্রিম অর্থ উত্তোলন করে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন আবদুল গফুর। বিভিন্ন কর্মচারীর নামে কোটি টাকারও বেশি অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর স্বাক্ষরও পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নেমপ্লেট ও গেইট নির্মাণের কাজ একটি প্রতিষ্ঠানের নামে দিলেও প্রকৃতপক্ষে নিজের প্রতিনিধির মাধ্যমে কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে। কাজ শুরুর আগেই ৩৭ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ফার্নিচার ক্রয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ৮০ হাজার টাকার টেবিল ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখিয়ে চারটি টেবিল ক্রয় করা হয়। দরপত্র ছাড়াই পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রশাসনের দাবি, ফার্নিচার খাতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা এবং বনায়নের নামে আরও ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভিযোগ, আবদুল গফুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে এবং কিছু শিক্ষার্থীকে উসকানি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পাহাড় কাটার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। প্রকল্প শুরুর আগে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) প্রতিবেদন প্রস্তুত ও অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত ৭
জানুয়ারি আইসিটি-সংক্রান্ত অপরাধ, শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্নের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পরে তিনি আদালতে আবেদন করলে আদালত প্রাথমিকভাবে স্থিতাবস্থা দিলেও সর্বশেষ শুনানিতে বরখাস্তের আদেশ বহাল রাখেন।
বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল আলমকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও দুইজন শিক্ষককে অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমান বলেন, “চরম অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আদালতও সেই আদেশ বহাল রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।”অন্যদিকে আবদুল গফুর দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই মিথ্যা।



















